স্রষ্টার অস্তিত্বের স্বপক্ষে তিনটি স্বতন্ত্র প্রমাণ

 

 

প্রফেসর রিচার্ড ডকিন্স সম্ভবত সমসাময়িক সময়ের সবচেয়ে বড় জ্ঞানী ও যুক্তিবাদী নাস্তিক – নিদেনপক্ষে তাঁর অনুসারীরা তেমনটাই বিশ্বাস করেন। সাদা চামড়ার বৃটিশ ও অক্সফোর্ড প্রফেসর হওয়ার সুবাদে অনেকেই তাঁর বাণীকে কোন রকম সংশয়-সন্দেহ ছাড়া গডের বাণীর মতই বিশ্বাস করেন! তাঁর প্রত্যেকটি কথা ও যুক্তি মনোযোগ দিয়ে শোনার চেষ্টা করেছি। তাঁর যুক্তিকে ইসলামের থিয়লজি ও কোরআনের সাথে তুলনা করে এবং সেই সাথে নিজের বিচার-বুদ্ধি দিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে লোকটার প্রতি বেশ করুণাই হয়েছে। তাঁর মতো একজন স্মার্ট মানুষও যে কীভাবে লর্ড জিসাস ও বাইবেলের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছেন, সেটা যাদের ইসলামের থিয়লজি ও কোরআন সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান আছে তারা ছাড়া অন্য কেউ বুঝবেন না।

 

যাহোক, নিদেনপক্ষে তিনটি স্বতন্ত্র তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে ইসলামে বিশ্বাসীরা তাদের নিজেদের বিচার-বুদ্ধি প্রয়োগ করে এই প্রাকৃতিক মহাবিশ্বের একজন মহান স্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাস করেন।

 

১. মহাশূন্য, ছায়াপথ, গ্রহ-নক্ষত্র, ও বিলিয়ন বিলিয়ন প্রজাতি তথা প্রাণীজগত ও উদ্ভিদজগত সহ এই প্রাকৃতিক মহাবিশ্ব এমনি এমনি সৃষ্টি হতে পারে না। একদমই অসম্ভব। শূন্য থেকে তো দূরে থাক এমনকি সবকিছু ব্যবহার করেও এই মহাবিশ্ব তো দূরে থাক, তার মতো ছোট-খাটো একটি মডেলও কেউ তৈরী করে দেখাতে পারবে না। নাস্তিকরা নিদেনপক্ষে এই মহাবিশ্বের ছোট-খাটো একটি মডেল তৈরী করে দেখাতে পারলেও শুরু করার মতো তাদের একটা পয়েন্ট থাকতে পারতো, যদিও তাতে প্রমাণ হবে না যে এই মহাবিশ্বের কোন স্রষ্টা নাই! কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সেটাও তারা পারবেন না। ফলে যারা বিশ্বাস করেন যে, তারা নিজেরা সহ এই প্রাকৃতিক মহাবিশ্ব এমনি এমনি সৃষ্টি হয়েছে, তারাই হচ্ছে প্রকৃত অন্ধ-বিশ্বাসী ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন। এই ধরণের অন্ধ-বিশ্বাস ও কুসংস্কারের আসলে কোন তুলনাই হয় না। এর চেয়ে বরং পেগান ও গ্রীক পৌরাণিক কাহিনীতে বিশ্বাস অনেক বেশী যৌক্তিক। যাহোক, প্রাণীজগত ও উদ্ভিদজগত সহ এই প্রাকৃতিক মহাবিশ্ব যেহেতু নিজে থেকে সৃষ্ট হতে পারে না সেহেতু এই মহাবিশ্বের একজন স্রষ্টা থাকতেই হবে। এটি একটি নৈব্যক্তিক ও অখণ্ডনীয় যুক্তি। আর সংজ্ঞা অনুযায়ী স্রষ্টার যেহেতু স্রষ্টা থাকতে পারে না সেহেতু “স্রষ্টাকে কে সৃষ্টি করেছে” প্রশ্নটি একেবারেই অবান্তর ও “না-প্রশ্ন” শ্রেণীর মধ্যে পড়ে।

 

২. আব্রাহাম, মোজেস, জিসাস, ও মুহাম্মদ (সাঃ) সহ অনেক মহা-মানব নিজেদেরকে এই মহাবিশ্বের স্রষ্টার মেসেঞ্জার বলে দাবি করেছেন। স্রষ্টার কোন অস্তিত্বই না থাকলে কেউ নিজেকে যেমন স্রষ্টার মেসেঞ্জার বলে দাবি করতে পারেন না তেমনি আবার স্রষ্টা থেকে মেসেজ পাওয়ারও দাবি করতে পারেন না। এটি স্রেফ কোন উটকো দাবিও নয়। যেমন মুহাম্মদ (সাঃ) দীর্ঘ তেইশ বছর ধরে শত প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁর দাবিকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর পূর্বের মেসেঞ্জাররাও তা-ই করেছেন। তাঁদের দাবি থেকে মাত্র দুটি উপসংহারে পৌঁছা যেতে পারে: (ক) তাঁরা সবাই মিথ্যাবাদী ও প্রতারক ছিলেন, যেটা বিশ্বাস করা প্রায় অসম্ভব। বরঞ্চ তাঁদের সবাইকে মিথ্যাবাদী ও প্রতারক হিসেবে বিশ্বাস করাটাই হচ্ছে একটি অন্ধ-বিশ্বাস ও আত্মপ্রতারণা। (খ) তাঁদের মধ্যে একজনও যদি সত্যবাদী হয়ে থাকেন সেক্ষেত্রে এই মহাবিশ্বের যে একজন স্রষ্টা আছেন, তাতে সংশয়-সন্দেহের কোনই অবকাশ নেই। ইসলামে বিশ্বাসীরা যেহেতু তাঁদের কাউকেই মিথ্যাবাদী বা প্রতারক হিসেবে বিশ্বাস করেন না, কোরআনের আলোকে এমন বিশ্বাসের পেছনে কোন যৌক্তিকতাও নেই, সেহেতু তাদের কাছে এটি একটি অকাট্য প্রমাণ বা ধ্রুব সত্য। এমনকি ইহুদী-খ্রীষ্টানদের কাছেও এটি একটি অকাট্য প্রমাণ বা ধ্রুব সত্য।

 

৩. কোরআন নামক ধর্মগ্রন্থটি যে কোন মানুষের নিজস্ব বাণী হতে পারে না – তার স্বপক্ষে বেশ কিছু যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে। যে কেউ নিরপেক্ষ মন-মানসিকতা ও ঠান্ডা মাথায় কোরআন নিয়ে অধ্যয়ন করলে এই সিদ্ধান্তে উপণীত হওয়া উচিত যে, কোরআনের মতো একটি গ্রন্থ লিখা মানুষের পক্ষে সত্যি সত্যি অসম্ভব। কারণ: (ক) কোরআনের মতো করে একটি গ্রন্থ লিখতে হলে সর্বপ্রথমে একজন মানুষকে একই সাথে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মিথ্যাবাদী, প্রতারক, জ্ঞানী, বুদ্ধিমান, ও স্মার্ট হতে হবে। তার পেছনে অনেকগুলো কারণের মধ্যে একটি হচ্ছে কোরআন লিখা হয়েছে প্রত্যক্ষ উক্তিতে, পরোক্ষ উক্তিতে নয়। অর্থাৎ কোরআনের বক্তা হচ্ছেন স্বয়ং এই মহাবিশ্বের স্রষ্টা (স্রষ্টা দাবিদার), কোন মানুষ নয়। এমনকি কোরআনের ভাষা ও বাচনভঙ্গিও অন্য যে কোন গ্রন্থ থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। (খ) কোনভাবেই স্বঘোষিত নাস্তিক হওয়া যাবে না। কারণ স্বঘোষিত নাস্তিক হয়ে স্রষ্টার নামে কিছু লিখলে মিথ্যাবাদী ও জোচ্চোর হিসেবে জনগণের কাছে হাতে-নাতে ধরা খেয়ে যাবে! ফলে স্বঘোষিত নাস্তিকরা কিন্তু ইচ্ছে করলেও কোরআন বা অন্য কোন ধর্মগ্রন্থের মতো একটি গ্রন্থ লিখতে পারবেন না! (গ) কোরআনের মধ্যে যে তথ্য আছে তার সঠিক ব্যাখ্যা এখন পর্যন্তও কেউ দিতে পারেনি। কেউ বলে কোরআন হচ্ছে মুহাম্মদের বাণী। কেউ বলে ইহুদী রাবাইদের বাণী! কেউ বলে খ্রীষ্টান পাদ্রীদের বাণী! কেউ বলে স্যাটানের বাণী! কেউ বলে ডেভিলের বাণী! কেউ বলে মৃগী রোগীর বাণী! কেউ বা আবার বলে মুহাম্মদের কোন এক সেক্রেটারির বাণী! তার মানে কোরআন বিরোধীরাই এখন পর্যন্ত নিজেদের মধ্যে ঐক্যমতে পৌঁছতে পারেনি!

 

সকালবেলা কোরআনকে মুহাম্মদের বাণী বলে দাবি করা হয়। ভাল কথা। কিন্তু দুপুর হতে না হতে মত পাল্টে যায়! তখন কোরআন হয়ে যায় ইহুদী রাবাইদের বাণী! বিকালবেলা হয় খ্রীষ্টান পাদ্রীদের বাণী! সন্ধ্যায় আবার হয়ে যায় ডেভিলের বাণী! ডিনারের সময় হয় স্যাটানের বাণী! মাঝরাতে আবার হয়ে যায় মৃগী রোগীর বাণী! এ নিয়ে সারারাত জেগে কোন কুল-কিনারা না পেয়ে ভোরবেলা হতাস হয়ে হয়ত বলা হয়, কোরআন আসলে উপরোল্লেখিত সবারই বাণী! প্রকৃত মৃগী রোগী ও ডেলিউডেড যে কে বা কারা – তা সাধারণ বোধসম্পন্ন যে কারো বোঝার কথা। দশজন কোরআন বিরোধীকে যদি আলাদাভাবে মন্তব্য করতে বলা হয় সেক্ষেত্রে তারা হয়ত নিদেনপক্ষে পাঁচ রকম উপসংহারে পৌঁছবে। মানব জাতির ইতিহাসে দ্বিতীয় কোন গ্রন্থ সম্পর্কে এরকম অদ্ভুত ও বিক্ষিপ্ত মতামত নেই। কোরআন বিরোধীরাই আসলে প্রমাণ করে দিয়েছে যে, কোরআন কোন মানুষের বাণী নয়। কিন্তু একই কথা কোরআনে বিশ্বাসীরা বলতে গেলেই যত্তসব দোষ! তবে কোরআন বিরোধীরা যেমন কোন যুক্তি-প্রমাণ ছাড়াই কোরআনকে ডেভিল বা স্যাটানের বাণী হিসেবে বিশ্বাস করে, কোরআনে বিশ্বাসীরা তেমনি অনেক যুক্তি-প্রমাণের আলোকে কোরআনকে এই মহাবিশ্বের স্রষ্টার বাণী হিসেবে বিশ্বাস করে।

 

যাহোক, এই মহাবিশ্বের স্রষ্টার অস্তিত্বের স্বপক্ষে তিনটি স্বতন্ত্র তত্ত্ব বা যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রত্যেকটি তত্ত্বকে মাইক্রো লেভেলে ব্যাখ্যা করতে গেলে লেখার কলেবর অনেক বড় হয়ে যাবে। এই তত্ত্ব তিনটির মধ্যে মিথ বা অন্ধ-বিশ্বাস বা কুসংস্কারের কোন স্থান নেই।

 

এবার মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন হচ্ছে এই মহাবিশ্বের যে স্রষ্টা নাই, তার স্বপক্ষে নাস্তিকদের কাছে স্বতন্ত্র কোন যুক্তি-প্রমাণ আছে কিনা? ওয়েল, বিশাল একখান অশ্বডিম্ব! আর থাকবেই বা কী করে। থাকার প্রশ্নই ওঠে না। এ কারণেই তারা (অপ)বিজ্ঞানের মধ্যে মাথা গোঁজা শুরু করেছেন। (অপ)বিজ্ঞান-ই হচ্ছে তাদের গড! অথচ মুসলিম কিডদের কাছে বিজ্ঞান ও অপবিজ্ঞান হচ্ছে মনুষ্য তৈরী দুটি টুল মাত্র! মুসলিম কিডদের কাছে যেটি নিছকই একটি টুল, অক্সফোর্ড প্রফেসর ডকিন্সের মতো নাস্তিকদের কাছেও সেটিই হচ্ছে গড! অধিকন্তু, বিজ্ঞান যেহেতু একটি পরিবর্তনশীল বিষয়, বিশেষ করে প্রোবাবিলিস্টিক ক্ষেত্রে, সেহেতু বিজ্ঞানের উপর ভিত্তি করে দর্শনভিত্তিক কোন বিষয়ে স্বতন্ত্র কোন তত্ত্ব দাঁড় করাতে যাওয়াটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় অপবিজ্ঞান।

 

স্রষ্টার অস্তিত্বের পক্ষে যারা প্রমাণ চায়

 

আস্তিক-নাস্তিক নির্বিশেষে যে কেউ স্বীকার করতে বাধ্য যে, এই মহাবিশ্বের স্রষ্টা সম্পর্কীত প্রশ্নটি (স্রষ্টা আছে কি নেই) যেমন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেমনি আবার এই প্রশ্নের উত্তরও সবেচেয়ে জটিল। আর তা-ই যদি হয় তাহলে একই সাথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে সহজ-সরল ও প্রাসঙ্গিক কিছু প্রশ্নের উত্তর জানা অতি আবশ্যক। অন্যথায় সারা জীবন চড়কীর মতো ঘুরপাক খেতে হবে।

 

যাদের ভিডিও গেমস খেলার অভিজ্ঞতা আছে তারা নিশ্চয় অবগত যে, কিছু কিছু গেমসে খুব সহজ লেভেল থেকে শুরু করে একাধিক লেভেল থাকে। প্রথম লেভেল অতিক্রম করতে না পারলে দ্বিতীয় লেভেলে যাওয়া যায় না। লেভেল যতই বাড়তে থাকে ততই কঠিন হয়। এই মহাবিশ্বের স্রষ্টার ব্যাপারটাও কিছুটা মাল্টি-লেভেল গেমসের মতো – যেখানে স্রষ্টা সম্পর্কীত প্রশ্নটি হচ্ছে সর্বশেষ লেভেল। ফলে যারা স্রষ্টার অস্তিত্বের পক্ষে ‘প্রমাণ’ চায় তাদেরকে আগে প্রাথমিক তিনটি লেভেল অতিক্রম করা উচিত।

 

লেভেল-১: স্রষ্টার অস্তিত্বের পক্ষে ‘প্রমাণ’ বলতে আসলে কী বুঝানো হয়? কী ধরণের ‘প্রমাণ’ দেখালে তারা স্রষ্টার অস্তিত্বকে মেনে নেবেন এবং কেন?

 

লেভেল-২: বিশ্ববাসীর কাছে তারা নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে পারবেন কিনা?

 

লেভেল-৩: এখানে আর এইখানে একজনকে দেখিয়ে এই মহাবিশ্বের স্রষ্টা বলে দাবি করা হয়েছে। স্বচক্ষে দেখেও তাকে স্রষ্টা হিসেবে মেনে না নেওয়ার পেছনে যৌক্তিক ও নৈব্যক্তিক কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে।

 

এই তিনটি লেভেল অতিক্রম না করে ইসলামে বিশ্বাসীদের কাছে স্রষ্টার অস্তিত্বের পক্ষে প্রমাণ চাওয়া আর মাল্টি-লেভেল গেমসের ক্ষেত্রে প্রাথমিক লেভেল অতিক্রম না করে সর্বশেষ লেভেলে যাওয়ার চেষ্টা করা একই কথা। এমনকি অসততাও বটে।

 

 

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s