E = MC2 কি নির্ভুল?

E = MC2 কি নির্ভুল?

 

 

 

 

 

 

দৌড়ে আলোকে হারিয়ে

দিল ভুতুড়ে কণা

 

আলবার্ট আইনস্টাইন কি ভুল বলেছিলেন? এই ব্রহ্মাণ্ডে সর্বোচ্চ গতি সম্পর্কে তাঁর ধারণা কি মিথ্যে? নিউট্রিনো, বিচিত্র চরিত্রের জন্য যাঁদের আর এক নাম ‘ভুতুড়ে কণা’, তাদের কাছে কি হেরে যাবেন পদার্থবিজ্ঞানের সম্রাট?

বিখ্যাত ভারতীয় পদার্থবিজ্ঞানী এনাক্কাল চণ্ডী জর্জ (ই সি জি) সুদর্শন বহু কাল ধরে বলে আসছেন আলোর চেয়ে দ্রুততর কণার অস্তিত্বের কথা। কিন্তু তা এত কাল তাত্ত্বিক সম্ভাবনা হিসেবেই গণ্য হয়ে এসেছে। এ বার কি আইনস্টাইন ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়ে সমাদর পাবেন সুদর্শন?

যদি তাই হয়, তা হলে অন্তত তত্ত্বে হলেও সম্ভব হবে অতীতে পৌঁছে যাওয়া। টাইম ট্রাভেল ইনটু দ্য পাস্ট। নিজের শৈশবে ফেরত যাওয়ার মতো টাইম মেশিন এক্ষুনি না-ই বা তৈরি করা গেল, তাতে কী-ই বা যায়-আসে? তেমন সম্ভাবনার দরজা যদি খোলে, তাতেই বা মন্দ কী?

প্রশ্ন এবং সম্ভাবনাগুলো নিয়ে তোলপাড় পদার্থবিদ্যার জগৎ। টুইটার, ফেসবুক, ব্লগ মন্তব্যে ছয়লাপ।

সব কিছুর মূলে এক পরীক্ষার ফলাফল। যা ঘোষিত হল শুক্রবার দুপুরে।

 

‘নিউট্রিনো রিসার্চ গ্রুপের’ প্রধান ডারিও অতেরিও (বাঁ দিকে) এবং

বার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আন্তোনিয়ো এরিদিতাতো। ছবি: এ এফ পি

আইনস্টাইন বলেছিলেন, আলোর চেয়ে বেশি বেগে আর কেউ ছোটে না এই ব্রহ্মাণ্ডে। শূন্যস্থানে আলো এক সেকেন্ডে পাড়ি দেয় ২৯৯,৯৯২,৪৫৮ মিটার। এর চেয়ে বেশি বেগে দৌড়তে পারে না আর কোনও কিছুই। এই দাবি (যা আগে বহু পরীক্ষায় প্রমাণিত) আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের ভিত। বস্তুত ওই গতিসীমার উপর দাঁড়িয়ে আছে গোটা পদার্থবিদ্যার অনেকখানি।

এক দল ইউরোপীয় বিজ্ঞানীর পরীক্ষার ফলাফলে জানা গেল, ওই গতিসীমা ঠিক নয়। কী পরীক্ষা? জেনিভার কাছে ভূগর্ভে গবেষণাগার ‘সার্ন’ থেকে কাতারে কাতারে ছোড়া হয়েছিল বিশেষ জাতের কণা ‘নিউট্রিনো’। মাটি ফুঁড়ে সে কণারা গিয়ে পৌঁছয় ৭৩০ কিলোমিটার দূরে ইতালির গ্রান সাসো পাহাড়ে অন্য এক গবেষণাগারে। দেখা যায়, নিউট্রিনো ছুটছে সেকেন্ডে প্রায় ৩০০,০০৬,০০০ মিটার বেগে। ওই দূরত্ব পাড়ি দিতে আলোর লাগত ১ সেকেন্ডের ১০,০০০ ভাগের ২৩ ভাগ সময়। কিন্তু নিউট্রিনো কণাদের লেগেছে তার চেয়ে ১ সেকেন্ডের ১০০,০০০,০০০ ভাগের ৬ ভাগ কম সময়। অর্থাৎ নিউট্রিনোরা ছুটতে পারে আইনস্টাইন-কল্পিত গতিসীমা ছাড়িয়ে।

শুক্রবার দিনটা যেন নির্ধারিত ছিল আইনস্টাইনের জন্যই। এ দিনই প্রকাশিত হল ‘নেচার’ জার্নালের যে সংখ্যা, তাতে প্রকাশিত হয়েছে কোপেনহাগেনের এক দল বিজ্ঞানীর পরীক্ষার ফলাফল। জানা গিয়েছে, আইনস্টাইনের আর এক মহা-তত্ত্ব, সাধারণ আপেক্ষিকতা নির্ভুল। একই দিনে ঘোষিত আর এক পরীক্ষার ফল কিন্তু সন্দেহ জাগাল বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব সম্পর্কে।

 

সন্দেহ বলে সন্দেহ! বিশেষ আপেক্ষিকতা ভুল প্রমাণিত হলে পদার্থবিদ্যা অনেকটাই যে যাবে উল্টেপাল্টে। বিজ্ঞানী মহলে তাই এখন কী-হয় কী-হয় গুঞ্জন। নিউট্রিনো দৌড় পরীক্ষা করছিলেন যে সব বিজ্ঞানীরা তাঁদের মুখপাত্র এবং বার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আন্তোনিও এরিদিতাতো বলেছেন, “ফলাফল দেখে আমরা স্তম্ভিত। আমরা পরীক্ষা করেছি বহু মাস ধরে। খতিয়ে দেখেছি নানা দিক থেকে নানা ভাবে। এমন কোনও যান্ত্রিক ত্রুটি শনাক্ত করতে পারিনি, যা ব্যাখ্যা করতে পারে পরীক্ষার আশ্চর্য ফলাফল। আমরা তো আমাদের পরীক্ষা চালিয়ে যাবই। সেই সঙ্গে আমরা তাকিয়ে থাকব অন্যান্য দলের নিরপেক্ষ পরীক্ষার দিকে। জানতে চাইব আমাদের পর্যবেক্ষণ ঠিক কিনা।”

আইনস্টাইন কি ভুল প্রমাণিত হলেন? নিউট্রিনো পরীক্ষার অবিশ্বাস্য ফলাফল নিয়ে মন্তব্য করেছেন বিখ্যাত ব্রিটিশ বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং। সাংবাদিকরা এ ব্যাপারে তাঁর প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি বলেছেন, “এখনও মন্তব্য করার সময় আসেনি। আরও পরীক্ষা ও পর্যালোচনা দরকার।” আর এক ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞানী এবং রয়্যাল সোসাইটির প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট স্যর মার্টিন রিস বলেছেন, “অত্যাশ্চর্য দাবির সপক্ষে অত্যাশ্চর্য প্রমাণ প্রয়োজন। এটুকু বলতে পারি, এ দাবিটি অত্যাশ্চর্য।”

সার্নের যে বিজ্ঞানী দল নিউট্রিনোর ঝাঁক পাঠিয়েছিলেন সান গ্রাসো পাহাড়ের গবেষণাগার লক্ষ্য করে, তাঁদের নেতা সার্জিও বার্তোলুচি বলেছেন, “যখন কোনও পরীক্ষায় আপাত-অবিশ্বাস্য ফলাফল বেরিয়ে আসে এবং যার পিছনে কোনও যান্ত্রিক বা মাপজোখের ত্রুটি খুঁজে পাওয়া যায় না, তখন সাধারণ নিয়মেই ফলাফল পেশ করা হয় ব্যাপকতর যাচাইয়ের জন্য। গবেষকরা তাই করেছেন। এটা চমৎকার বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ। ফলাফল যদি চূড়ান্ত ভাবে প্রমাণিত হয়, তা হলে হয়-তো বদলে যাবে পদার্থবিদ্যা সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গী। কিন্তু তার আগে আমাদের নিশ্চিত হতে হবে যে, গবেষকদের পরীক্ষায় কোনও ত্রুটি ছিল না, অথবা আর কোনও ভাবে নিউট্রিনোর অবিশ্বাস্য বেগ ব্যাখ্যা করা যায় না।”

বার্তোলুচির মন্তব্যে সায় দিয়েছেন এরিদিতাতো। তিনি বলেছেন, “আমাদের পরীক্ষার ফলাফল এতই বড় যে এক্ষুনি কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। আমার প্রথম প্রতিক্রিয়া হল, নিউট্রিনো এখনও রহস্যের ডালি সাজিয়ে বিস্মিত করছে আমাদের।” সত্যিই নিউট্রিনো এক রহস্যময় কণা। প্রতি মুহূর্তে লক্ষ-কোটি-অর্বুদ-নির্বুদ ওই কণা ভেদ করে যাচ্ছে যে কোনও মানুষের দেহ। বাড়িঘর, গাছপালা, পাহাড়-পর্বত, এমন কী গোটা পৃথিবী ভেদ করে অবাধে ওরা ছুটে যাচ্ছে ব্রহ্মাণ্ডের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। ছুটে যাচ্ছে কোনও প্রতিক্রিয়া ছাড়াই। এবং ছুটতে ছুটতেই এক জাতের নিউট্রিনো ভেক বদল করে বনে যাচ্ছে অন্য জাতের নিউট্রিনো। ওরা বাস্তবে থাকলেও, ওদের উপস্থিতি শনাক্ত করা এক দুরূহ কাজ। এ জন্য নিউট্রিনোকে বলা হয় ‘ভুতুড়ে’ কণা।

 

 

 

এ-হেন ভুতুড়ে কণার রকম-সকম পরীক্ষা করার জন্য ভারতীয় বিজ্ঞানীরা হাতে নিয়েছেন ১০০০ কোটি টাকার প্রকল্প। ভারতীয় গবেষক দলের মুখপাত্র এবং টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ-এর অধ্যাপক নবকুমার মণ্ডল রীতিমতো বিস্মিত ইউরোপীয় গবেষকদের পরীক্ষার ফলাফলে। মুম্বই থেকে টেলিফোনে বললেন, “নিউট্রিনোর আস্তিনে যে আর কত জাদু লুকিয়ে আছে, তা ভেবে মজা পাচ্ছি। পরীক্ষার ফলাফল অভাবনীয়। তবে, তা চূড়ান্ত সত্যি কিনা, তা বলার সময় এখনও আসেনি। এ রকম পরীক্ষা আরও করা দরকার। যেমন, আমেরিকায় ফার্মিল্যাব গবেষণাগার থেকে ৭৩৫ কিলোমিটার দূরে মিনেসোটা প্রদেশের সুদান খনিতে ছোড়া হচ্ছে নিউট্রিনো। ওই কণাও আলোর চেয়ে বেশি বেগে দৌড়চ্ছে কি না, তা জানা দরকার।”

সার্ন এবং গ্রান সাসো-র মধ্যে ছুটন্ত নিউট্রিনো নিয়ে যাঁরা পরীক্ষা করেছেন, তাঁদের এক জন দারিও আউতিয়েরো বলেছেন, “সার্ন এবং গ্রান সাসো-র মধ্যে সময় মাপার ক্ষেত্রে আমরা ন্যানো সেকেন্ড (১ সেকেন্ডের একশো কোটি ভাগের এক ভাগ) পর্যায়ে নিখুঁত ছিলাম। আর দু’টো জায়গার মধ্যে দূরত্ব মাপার ক্ষেত্রে মাত্র ২০ সেন্টিমিটারের এদিক-ওদিক হতে পারে। তাই যান্ত্রিক পর্যায়ে অনিশ্চয়তার সুযোগ সামান্য। পরিসংখ্যানগত দিক থেকে আমাদের ফলাফল খুবই উচ্চ মানের। আমরা তা পেশ করছি যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে। এ জন্যই আমরা অন্যদের সঙ্গে আমাদের ফলাফল মিলিয়ে দেখতে চাইছি।”

ব্রিটেনে ম্যাঞ্চেস্টার ইউনিভার্সিটিতে কণা-পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক জেফ ফোরশ জানিয়েছেন, তিনিও তাকিয়ে থাকবেন অন্য পরীক্ষার ফলাফলের দিকে। এর তাৎপর্যের কথা ভেবেই। এক সংবাদসংস্থাকে তিনি বলেছেন, “আলোর বেগ শুধু ব্রহ্মাণ্ডে গতির ঊর্ধ্বসীমাই নয়, এর মধ্যে বাঁধা আছে কার্য-কারণ সম্পর্কও। এর জন্যই আগে কারণ না থাকলে কার্য হয় না। আলো যদি সর্বোচ্চ গতিশীল না হয়, তা হলে ভেঙে যাবে ওই সম্পর্ক। তখন আগে কার্য পরে কারণ।” অর্থাৎ ফোরশ বলতে চাইছেন, মৃত্যুর পরে গুলি বার হবে বন্দুক থেকে। ফোরশ-র কথায়, “নিউট্রিনো যদি সত্যি-সত্যিই আলোর চেয়ে বেশি বেগে দৌড়য়, তা হলে আজকের তথ্য পাঠিয়ে দেওয়া যাবে গত কালের কাছে। অন্য ভাবে বললে, টাইম মেশিনে চড়ে অতীতে ফিরে যাওয়ার যে বর্ণনা কল্পবিজ্ঞানে আখছার মেলে, তার কাছাকাছি। যদিও এর মানে এই নয় যে, আমরা খুব শিগগিরই বানিয়ে ফেলতে পারব অতীতযাত্রার টাইম মেশিন।”

 

 

 

লেখাটির বিষয়বস্তু(ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড): আলবার্ট আইনস্টাইন কি ভুল বলেছিলেন? এই ব্রহ্মাণ্ডে সর্বোচ্চ গতি সম্পর্কে

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s